প্রকাশিত · ৭ সেপ্ট ২০২৬
ছোট ব্যবসার ভ্যাট ও মূসক ৬.২ — সহজ ভাষায় যা জানা দরকার
ভ্যাট নিয়ে ছোট ব্যবসার মালিকদের প্রধান সমস্যা জ্ঞানের অভাব নয় — সমস্যা হলো হিসাবটা সারা বছর রাখা হয় না, আর রিটার্নের সময় এসে সব একসাথে বানাতে হয়। তখনই ভুল হয়, তখনই খরচ বাড়ে।
এই লেখাটা আইনের ব্যাখ্যা নয়। এটা হলো: কোন কাগজগুলো সারা বছর রাখলে ভ্যাটের ঝামেলা প্রায় শেষ হয়ে যায়।
প্রথমে: আপনি আসলে কোন ঘরে পড়েন
বাংলাদেশে ব্যবসার আকার অনুযায়ী তিনটা অবস্থান হয়:
- নিবন্ধনের সীমার নিচে — বার্ষিক টার্নওভার কম হলে ভ্যাট নিবন্ধন লাগে না।
- টার্নওভার ট্যাক্স — মাঝারি সীমার ব্যবসা টার্নওভার করের আওতায় পড়ে, হার কম, হিসাবও সহজ।
- ভ্যাট নিবন্ধিত — সীমার উপরে গেলে নিয়মিত ভ্যাট, চালান আর মাসিক রিটার্ন।
সীমাগুলো সময়ে সময়ে বদলায়, তাই সংখ্যা মুখস্থ না করে বছরে একবার আপনার হিসাবরক্ষক বা স্থানীয় ভ্যাট অফিস থেকে বর্তমান সীমাটা জেনে নিন। যেটা বদলায় না সেটা হলো — টার্নওভার কত, তা আপনার জানা থাকতে হবে। আর সেটা জানার একমাত্র পথ হলো প্রতিটা বিক্রি লেখা।
মূসক ৬.২: বিক্রির চালান
ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসার প্রতিটা বিক্রির সাথে যে চালান দিতে হয়, সেটাই মূসক ৬.২। এতে যা থাকতে হয়:
- আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা আর বিআইএন
- ক্রেতার নাম-ঠিকানা (আর নিবন্ধিত হলে বিআইএন)
- চালানের ক্রমিক নম্বর ও তারিখ
- পণ্যের বিবরণ, পরিমাণ, একক দর
- ভ্যাট বাদে মূল্য, ভ্যাটের হার, ভ্যাটের অঙ্ক আর সর্বমোট
দুটো জিনিস মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুল করে: ক্রমিক নম্বরে ফাঁক রাখা, আর ভ্যাটসহ দামকে ভ্যাট বাদে দাম হিসেবে লেখা।
ভ্যাটসহ দাম থেকে ভ্যাট বের করার নিয়ম
দোকানে দাম সাধারণত ভ্যাটসহ বলা হয়। ১৫% হারে ভ্যাটসহ দাম থেকে মূল দাম বের করার নিয়ম:
মূল দাম = ভ্যাটসহ দাম ÷ ১.১৫ ভ্যাট = ভ্যাটসহ দাম − মূল দাম
উদাহরণ: ভ্যাটসহ ১,১৫০ টাকা হলে মূল দাম ১,০০০ টাকা, ভ্যাট ১৫০ টাকা।
ভুলটা হয় যখন কেউ ১,১৫০-এর উপর ১৫% বসিয়ে ১৭২.৫০ লিখে ফেলে। মাসে কয়েকশো চালানে এই ভুল বড় অঙ্ক দাঁড়ায়।
রেয়াত: যে টাকাটা ফেরত পাওয়ার কথা
নিবন্ধিত সরবরাহকারীর কাছ থেকে বৈধ চালানসহ কিনলে সেই কেনার ভ্যাট আপনার প্রদেয় ভ্যাট থেকে বাদ যায়। এটাই রেয়াত (ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট)।
শর্ত একটাই, কিন্তু কড়া: কেনার চালান থাকতে হবে। চালান ছাড়া কেনা মানে সেই ভ্যাটটা আপনার খরচ, ফেরতযোগ্য নয়। ছোট ব্যবসা যত টাকা বাড়তি দেয়, তার বড় অংশ এখানেই যায় — মাল কেনা হয়েছে, চালান নেওয়া হয়নি।
কাজেই একটা অভ্যাস: প্রতিটা কেনার চালান, প্রতিবার। দাম একটু বেশি পড়লেও নিবন্ধিত সরবরাহকারী থেকে চালানসহ কেনা প্রায়ই সস্তা পড়ে।
সারা বছর যা রাখলে রিটার্ন সহজ
রিটার্নের সময় যে চারটা জিনিস লাগে, সেগুলো সারা বছর জমতে থাকলে কাজটা এক ঘণ্টার:
- বিক্রির খাতা — তারিখ, চালান নম্বর, ভ্যাট বাদে মূল্য, ভ্যাট।
- কেনার খাতা — সরবরাহকারী, চালান নম্বর, মূল্য, ভ্যাট।
- স্টকের হিসাব — কী ঢুকল, কী বেরোলো।
- জমার রসিদ — যা ট্রেজারিতে জমা দেওয়া হয়েছে।
এই চারটা যদি প্রতিদিনের এন্ট্রি থেকে নিজে থেকে তৈরি হয়, তাহলে মাস শেষে আলাদা করে কিছু বানাতে হয় না। এটাই সফটওয়্যার ব্যবহারের আসল কারণ — রিটার্ন নিজে থেকে দাখিল হওয়া নয়, বরং রিটার্নের কাঁচামালটা সারা বছর তৈরি থাকা।
হিসাব সফটওয়্যারে যা দেখে নেবেন
- ভ্যাটসহ ও ভ্যাট বাদে দাম — দুইভাবেই দাম বসানো যায় কি না।
- চালানের ক্রমিক নম্বর নিজে থেকে ওঠে কি না, ফাঁক ছাড়া।
- কেনার ভ্যাট আলাদা করে রাখা যায় কি না (রেয়াতের জন্য)।
- মাস ধরে বিক্রি, কেনা আর ভ্যাটের সারসংক্ষেপ বের হয় কি না।
- এক্সেলে রপ্তানি — কারণ আপনার হিসাবরক্ষক ওটাতেই কাজ করেন।
একটা সতর্কতা
এই লেখা সাধারণ ধারণার জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। হার, সীমা আর ফরমের নিয়ম বদলায়, আর ব্যবসাভেদে ব্যতিক্রম আছে। বড় সিদ্ধান্তের আগে একজন ভ্যাট পরামর্শক বা আপনার সার্কেল অফিসে কথা বলে নিন।
তবে যেটা কখনো বদলায় না: যে ব্যবসার প্রতিদিনের হিসাব ঠিক থাকে, তার ভ্যাট নিয়ে ভয় থাকে না।
নিজের দোকানে চালিয়ে দেখবেন?
ফ্রি শুরু করুন, অথবা হোয়াটসঅ্যাপে দোকানের কথা বলুন — আমরা এসে সেটআপ করে দিই।